দেশের নারীরা তৈরি পোশাক শিল্প, ই-কমার্স ও কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন খাতে যুক্ত থাকলেও আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার সীমাবদ্ধতায় মূল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এখনো পুরুষদের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছেন। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বৈষম্য রয়ে গেছে। বিশেষ করে আইনি সুরক্ষার ঘাটতি, ব্যবসায়িক ঋণ ও জামানত পাওয়ার সীমিত সুযোগ এবং দক্ষতার অভাবের কারণে অনেক নারী অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত হতে পারছেন না। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের ‘উইমেন, বিজনেস অ্যান্ড দ্য ল ২০২৬’ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নারীদের অর্থনৈতিক সুযোগ, আইনি কাঠামো ও এর বাস্তব প্রয়োগের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান আগের বছরের তুলনায় তিন ধাপ পিছিয়ে ১৭৯তম স্থানে নেমে এসেছে।
বিশ্বব্যাংক প্রতি বছর ‘উইমেন, বিজনেস অ্যান্ড দ্য ল রিপোর্ট’ প্রকাশ করে। মূলত নারীদের অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা ও সুরক্ষা নিশ্চিতে আইনি ও নীতিগত বাধাগুলো চিহ্নিত করে রাষ্ট্র ও সরকারকে সহায়তা করতে এটি প্রকাশ করা হয়। চলতি বছরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৯তম। মূলত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামোয় নারী-পুরুষ সমতা, সহায়ক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এবং সেসব আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন—এ তিন সূচকেই পিছিয়েছে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭৬ এবং ২০২২ সালে ছিল ১৭৩তম। দক্ষিণ এশিয়া এবং বিশ্বের অনেক নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ এসব সূচকে অগ্রগতি অর্জন করলেও বাংলাদেশ ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান কেবল আফগানিস্তানের ওপরে।
এ বছর তিনটি ক্যাটাগরিতে সবার ওপরে আছে স্পেন। এছাড়া শীর্ষ পাঁচে আরো রয়েছে ক্রোয়েশিয়া, স্লোভেনিয়া, ফ্রান্স ও ইতালি। ইউরোপ, আমেরিকা অঞ্চলের দেশগুলোয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে আইনি সহায়তা ও নীতিমালা থাকলেও পিছিয়ে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। যেখানে উন্নত রাষ্ট্রগুলোর স্কোর গড়ে ৮৮, সেখানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এ স্কোর ৪৫-এর ঘরে। বিশ্বব্যাংক বলছে, দক্ষিণ এশিয়া যদি নারীদের পূর্ণ অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে অঞ্চলটি তার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় অংশ হারাবে।
দক্ষিণ এশিয়ায় নারীদের আইনি সহায়তা ও বাস্তব প্রয়োগে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভারত। বিশ্বের ১৯০টি দেশের মধ্যে তাদের অবস্থান ১২৯তম। অন্যদিকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে নেপাল, তাদের অবস্থান ১৩০তম স্থানে। এছাড়া ভুটান ১৩৯, শ্রীলংকা ১৫৯, পাকিস্তান ১৬৩, বাংলাদেশ ১৭৯ এবং আফগানিস্তানের অবস্থান ১৯০তম। বৈশ্বিক স্কোরে বাংলাদেশে নারীদের জন্য আইনি কাঠামোতে স্কোর ৩৪ দশমিক ৩৮, সহায়ক কাঠামোতে ৩৪ দশমিক ৭৩। তবে এসব আইন প্রয়োগে স্কোর মাত্র ২৭ দশমিক ৯২।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও আইন ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে বড় ফারাক রয়েছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, শুধু আইন থাকলেই হবে না। সেই আইন কার্যকর করতে প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, বাস্তব প্রয়োগ এবং নারীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ। কিন্তু অধিকাংশ দেশে সে বাস্তবায়ন দুর্বল।
বাংলাদেশের মতো মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে অর্থনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ এখনো সীমিত। এর পেছনে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা, শিশুযত্নের সংকট, সমমজুরি বাস্তবায়নের দুর্বলতা, অর্থায়নে বৈষম্য এবং সামাজিক বাধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে ই-কমার্স, অনলাইন ব্যবসা ও তৈরি পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও বৈষম্য পুরোপুরি দূর হয়নি। বিশেষ করে নতুন নারী উদ্যোক্তারা জামানতের অভাব, ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা এবং ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থায় আস্থার সংকটের মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি, সাইবার সহিংসতা, নিরাপত্তার ঘাটতি ও বিচারহীনতাও নারীদের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
তরুণ উদ্যোক্তা হাসিন ফেরদৌসী বলেন, ‘কভিড-১৯-পরবর্তী সময়ে দেশে অনেক উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে। ডিজিটাল ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে অনেকে সফলও হয়েছেন। তবে এখানে প্রধান বাধা আর্থিক সংকট ও নিরাপত্তা। অর্থনীতিতে নারীদের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে হলে সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।’
বিশ্বব্যাংক তাদের রিপোর্টে বলছে, শ্রমবাজারে লিঙ্গ বৈষম্য কমাতে পারলে অনেক দেশের জিডিপি ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন দেশের প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, ‘কোনো দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির জন্য পুরুষের পাশাপাশি নারীর পণ্য ও সেবায় যে অবদান সেটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাদের আয়, উৎপাদনশীলতা বাড়লে সেটি প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। এছাড়া নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য তাদের প্রয়োজন ব্যাংক ঋণ, আর্থিক প্রণোদনা ও ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা। এগুলো সহজ করা গেলে নারীর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন দুটিই বাড়বে।’
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ এখনো সীমিত হলেও ধীরে ধীরে তা বাড়ছে, বিশেষ করে বেসরকারি ও উদ্যোক্তা খাতে। বিশ্বব্যাংক ও আইএফসির তথ্য বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশের ফরমাল সেক্টরে নারী মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা খুব বেশি না হলেও প্রবণতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন সামাজিক স্বীকৃতি, প্রণোদনা ও নিরাপত্তা।
অর্থনীতিতে নারীদের অবস্থানকে শক্তিশালী ও সুদৃঢ় করতে হলে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন সাবেক নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভিন হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘নারীরা পুরুষের তুলনায় সবক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। তারা নিরুপায় হয়ে মেনে নিয়েছে এ বৈষম্য। নারীদের আইনি ও সামাজিক স্বীকৃতি এবং যথাযথ মূল্যায়নের জন্য রাষ্ট্র ও সরকারকে কাজ করতে হবে। যেহেতু পরিবর্তন দরকার তাই রাজনৈতিক সদিচ্ছার ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এমন এক পরিবর্তনের জন্য নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন থেকে গত অন্তর্বর্তী সরকারকে অনেক সুপারিশ করেছিলাম। কিন্তু তা বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।’
নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ডসহ বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করেন জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সুলতানা জেসমিন জুঁই। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দেশে নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক—দুই খাতেই ঘাটতি রয়ে গেছে। নারীরা গৃহস্থালিতে অর্থনৈতিক ও উৎপাদনশীল কাজ করলেও সেটির মূল্যায়ন পাচ্ছে না। নারীদের অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডকেও মূল অর্থনৈতিক ধারার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। সেজন্য প্রয়োজন দক্ষতা বৃদ্ধি ও কাজের মূল্যায়ন। এ ক্ষেত্রে সরকারের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একজন নারী যদি নিয়মিত সঞ্চয় করতে পারেন তাহলে বছর শেষে সেই অর্থ দিয়ে ছোট পরিসরে হলেও কোনো ব্যবসা শুরু করার সুযোগ তৈরি হবে।’